গণমাধ্যমে মোশন গ্রাফিক্স
একসময় সংবাদ পরিবেশনের প্রধান মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন। তথ্যকে দর্শক বা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মূলত লেখা, স্থির ছবি এবং ভিডিও ফুটেজের ওপর নির্ভর করা হতো। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ এবং দর্শকের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের উপস্থাপন পদ্ধতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মোশন গ্রাফিক্স।
বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সংবাদপত্রের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ধরনের ভিডিও কনটেন্টে মোশন গ্রাফিক্স শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপাদান নয়; বরং তথ্যকে দ্রুত, সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের একটি কার্যকর মাধ্যম।
সহজভাবে বলতে গেলে স্থির গ্রাফিক্স, টাইপোগ্রাফি, ছবি, আইকন, চার্ট, ইলাস্ট্রেশন ও বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল উপাদানকে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে গতিশীল করে তোলাই মোশন গ্রাফিক্স।
টেলিভিশন নিউজ প্রোডাকশনে মোশন গ্রাফিক্স এখন প্রায় অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। সংবাদ শুরু হওয়ার আগে থেকে শুরু করে পুরো সংবাদ উপস্থাপনের বিভিন্ন পর্যায়ে এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। একটি নিউজ বুলেটিন বা বিশেষ অনুষ্ঠানের শুরুতে লোগো এনিমেশন, টাইটেল এনিমেশোন, ইন্ট্রো সিকুয়েন্স এবং বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল ট্রানজিশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের পরিচয় তৈরি করা হয়।
সংবাদ উপস্থাপক, অতিথি, বিশেষজ্ঞ বা প্রতিবেদকের নাম ও পরিচয় দেখানোর জন্য লোয়ার থার্ড ব্যবহার করা হয়। এটি দর্শককে একই সঙ্গে ভিডিও এবং প্রয়োজনীয় লিখিত তথ্য দেয়। ফলে উপস্থাপকের বক্তব্যের পাশাপাশি তথ্যটি চোখেও ধরা পড়ে।
ব্রেকিং নিউজ, টপ স্টোরি, লাইভ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংবাদকে আলাদা করে তুলে ধরতে মোশন গ্রাফিক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যানিমেটেড হেডলাইন, টিকার, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অন্যান্য ভিজ্যুয়াল উপাদান দর্শকের মনোযোগ দ্রুত আকর্ষণ করতে সাহায্য করে।
সংবাদে অনেক সময় বিপুল পরিমাণ পরিসংখ্যান বা জটিল তথ্য থাকে। যেমন – বাজেট, জনসংখ্যা, নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য, অর্থনৈতিক সূচক, আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর বা কোনো ঘটনার পরিসংখ্যান। এসব তথ্য শুধু মুখে বললে দর্শকের জন্য মনে রাখা কঠিন হতে পারে। মোশন গ্রাফিক্স এর মাধ্যমে বার চার্ট, পাই চার্ট, গ্রাফ, টাইমলাইন, ডায়াগ্রাম বা এনিমেটেড ইনফো গ্রাফিক্স ব্যবহার করে তথ্যকে দৃশ্যমান করা যায়। ফলে জটিল তথ্যকে তুলনামূলকভাবে সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।
দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক ঘটনা, ভ্রমণ, আবহাওয়া বা আন্তর্জাতিক সংবাদে লোকেশন ও জিয়োগ্রাফিক ইনফো গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সংবাদ শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, টিকটক এবং বিভিন্ন নিউজ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মানুষ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সংবাদ ও তথ্য গ্রহণ করছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো – দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার সময় তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ডিজিটাল নিউজ কনটেন্টে মোশন গ্রাফিক্স -এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
একটি দীর্ঘ সংবাদ প্রতিবেদনকে কয়েক মিনিটের এনিমেটেড এক্সপ্লেইনার ভিডিওতে রূপ দেওয়া যায়। আবার একটি বড় প্রতিবেদনকে ৩০ – ৬০ সেকেন্ডের সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও বা মোশন গ্রাফিক্স নিউজ কার্ড হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
মোশন গ্রাফিক্স – এর ব্যবহার শুধু নিউজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্পোর্টস প্রোগ্রামে প্লেয়ার স্ট্যাটিসটিক্স, স্কোরবোর্ড, ম্যাচ টাইমলাইন, টুর্নামেন্ট ব্র্যাকেট, টিম কমপ্যারিজন এবং পারফরম্যান্স চার্ট উপস্থাপনে মোশন গ্রাফিক্স ব্যবহৃত হয়।
একইভাবে এন্টারটেইনমেন্ট প্রোগ্রামে আর্টিস্ট প্রোফাইল, মুভি রিভিউ, মিউজিক চার্ট, ইভেন্ট ইনফরমেশন, কাউন্টডাউন এবং বিভিন্ন ধরনের ভিজ্যুয়াল প্যাকেজ তৈরি করা যায়। একটি টেলিভিশন চ্যানেল বা ডিজিটাল মিডিয়ার নিজস্ব ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি তৈরি করতেও মোশন গ্রাফিক্স গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে মোশন গ্রাফিক্স এখন শুধু একটি ভিডিওতে কিছু অ্যানিমেশন যোগ করা নয়; বরং একটি মিডিয়া ব্র্যান্ডের ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনের অংশ। মোশন গ্রাফিক্স এই প্রতিযোগিতায় তথ্যকে আরও ভিজ্যুয়াল, সংক্ষিপ্ত এবং কাঠামোবদ্ধভাবে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়।
বিশেষ করে – টেক্সট + ইমেজ + মোশন + সাউন্ড + ডেটা -এই উপাদানগুলো পরিকল্পিতভাবে একত্রিত করা গেলে একটি তথ্যভিত্তিক গল্পকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
এআই, রিয়েল-টাইম গ্রাফিক্স, ভার্চুয়াল প্রোডাকশন, থ্রিডি অ্যানিমেশন, অগমেন্টেড রিয়েলিটি এবং ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন প্রযুক্তির বিকাশের ফলে গণমাধ্যমে মোশন গ্রাফিক্সের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভবিষ্যতের নিউজরুমে শুধু একজন গ্রাফিক ডিজাইনার নয়, বরং এমন পেশাজীবীর প্রয়োজন হতে পারে যিনি একই সঙ্গে- গ্রাফিক ডিজাইন, মোশন ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, টাইপোগ্রাফি, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন, স্টোরিটেলিং, নিউজ ও ডিজিটাল কনটেন্টের ভাষা বুঝতে পারেন। অর্থাৎ মোশন গ্রাফিক্স এখন ক্রমশ একটি ক্রস-ডিসিপ্লিনারি মিডিয়া স্কিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গণমাধ্যমের পরিবর্তিত বাস্তবতায় মোশন গ্রাফিক্স আর কেবল সাজসজ্জার বিষয় নয়। সংবাদ, তথ্য, বিশ্লেষণ, অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন এবং ডিজিটাল কনটেন্ট – সব ক্ষেত্রেই এটি তথ্যকে দৃশ্যমান ও গতিশীলভাবে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এই কারণেই বর্তমান মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে মোশন গ্রাফিক্স একটি সৃজনশীল দক্ষতার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত দক্ষতা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
লেখক : সমীরণ দেওয়ান, হেড অব মোশন গ্রাফিক্স, কালের কণ্ঠ
প্রকাশক – মাধ্যম